
হাইকোর্ট বলেছে জোর করে পদত্যাগের বৈধতা নেই
রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে জোর করে পদত্যাগের অভিযোগে নতুন আইনি প্রশ্ন
সত্যখবর ডেস্ক ॥ কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা ও পরবর্তী সময়ে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ নিয়ে গত রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর এবার বিষয়টি নতুন করে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি রায়ে কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত বৈধতা নেই বলে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তাতে রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এর ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পরদিন তিনি কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট ২০২৬ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর ১৩ সেপ্টেম্বর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। আদালত বলেন, রিটকারী শিক্ষকের পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি; তাঁর স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগপত্রের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। একই সঙ্গে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আলকাছ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের ঘটনায় তদন্তের পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তাঁকে স্বপদে বহালের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত আরও বলেন, আইন ও বিধি জোরপূর্বক কিংবা চাপের মুখে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না। তবে এই রায় রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নয়। রায়টি গাজীপুরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ওই রায়ের ভিত্তিতে রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদত্যাগ বা চাকরিচ্যুতিকে সরাসরি বৈধ বলার সুযোগ নেই। বরং জোরপূর্বক পদত্যাগের আইনগত অবস্থান নিয়ে হাইকোর্টের এই সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছে। রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে জোরপূর্বক ও হুমকির মুখে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ওই সময় যাদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে বা সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তারা কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন, নাকি চাপ, ভয়ভীতি বা জোরপূর্বক তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল? কারণ স্বেচ্ছায় দেওয়া পদত্যাগ এবং জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত অবস্থান এক নয়। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়েও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৮ ডিসেম্বরের ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার পর সেটিকে পদত্যাগপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না; সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কোনো লিখিত প্রমাণ ছিল কি না; ১৯ জনকে চাকরিচ্যুত করার আগে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। বিশেষ করে কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ না করে থাকলে এবং তাঁর কাছ থেকে চাপ প্রয়োগ করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়ে থাকে- তাহলে সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী ছিল, সেটিই এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। এ জন্য ৮ ডিসেম্বরের ঘটনার সময়কার পদত্যাগপত্র, সাদা কাগজে নেওয়া স্বাক্ষর, চাকরিচ্যুতির আদেশ, সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণী, সিন্ডিকেট বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি কী ছিল, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল- এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গাজীপুরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলকাছ উদ্দিন আহমেদের মামলায় হাইকোর্টের রায় তাই রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কোনো সরাসরি আদালতের নির্দেশ নয়। কিন্তু জোরপূর্বক পদত্যাগের আইনগত বৈধতা নেই- আদালতের এই সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ রবীন্দ্র মৈত্রীর ৮ ডিসেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের আইনগত দিকটি নতুন করে সামনে এনেছে। এখন মূল প্রশ্ন- হাইকোর্ট যেখানে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনগত বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন, সেখানে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যে পদত্যাগপত্র বা সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেটি আসলে কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে পরবর্তী চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তিই বা কী ছিল?